সংসদে প্রধানমন্ত্রী : ‘ব্যর্থ ব্যর্থ’ বলে শত্রুর হাতে অস্ত্র তুলে দেয়ার মানে হয় না
বৃহস্পতিবার, ২৫ আগস্ট ২০১১

সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার চিত্র তুলে ধরে দু’দিন জাতীয় সংসদে মহাজোটের সংসদ সদস্যদের সমালোচনার জবাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
মন্ত্রিসভার সদস্যদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে গতকাল প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সব মন্ত্রণালয়ের কিছু না কিছু সফলতা রয়েছে। ব্যর্থ, ব্যর্থ, ব্যর্থ বলে এত জোরে আওয়াজ তুলে শত্রুর হাতে অস্ত্র তুলে দেয়ার কোনো মানে হয় না। তাহলে যেটুকু অর্জন আমরা করেছি সেটুকুও থাকবে না—সেটা মাননীয় সংসদ সদস্যদের মনে রাখতে হবে।
গতকাল জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্যদের একাধিক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। মহাসড়কের বেহাল দশা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে মহাজোটের সংসদ সদস্যদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। ওইদিন যোগাযোগমন্ত্রী ছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী. অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, নৌমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টার কঠোর সমালোচনা করেন ক্ষমতাসীন দলের সিনিয়র সংসদ সদস্যরা। গত মঙ্গলবারও
সমালোচনার এ ধারা অব্যাহত ছিল। এরই প্রেক্ষাপটে গতকাল সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে এসব সমালোচনার জবাব দেন। এর আগে মঙ্গলবার স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকও মন্ত্রীদের সমালোচনার জবাবে সরকারদলীয় সংসদ সদস্যদের বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হয়ে পরিস্থিতি অনুধাবন করার আহ্বান জানান। দলের সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কী পেলাম আর কী পেলাম না; কী নিলাম আর কী নিলাম না—বিষয়টি ছেলের হাতের মোয়া নয়। সব দোষ নন্দঘোষের ওপর চাপিয়ে দিয়ে লাভ কী! বিশ্বমন্দায় উচ্চমূল্যে চাল, তেল ও জ্বালানি কিনে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়েছে। এজন্য সরকার ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।
শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের ব্যাপক সফলতা রয়েছে—উল্লেখ করে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নুর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি অসুস্থ ছিলাম বলে কয়েকদিন আসতে পারিনি। বাসায় বসেই সংসদের কার্যক্রম শুনতাম। এখানে শুধু সরকারের ব্যর্থতার রেকর্ড শুনলাম। আজ সংসদে এসে এবার সফলতার কথা শুনলাম। ব্যর্থতার কথা আমরা এত শুনি যে, সফলতার কথা বলতেই চাই না। কেন এত মানসিক দৈন্য, তা বলতে পারব না। সরকারের প্রতিটি সেক্টর খতিয়ে দেখলে সফলতা পাওয়া যাবে। সরকারের গত আড়াই বছরে সফলতা নেই—এমন একটি জায়গা খুঁজে পাওয়া যাবে না। দশটায় সফলতা থাকলে আর একটায় কিছুটা ঘাটতি দেখা দিলে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে সরকার কিছুই করেনি।
মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানবিষয়ক জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সম্পূরক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাঙালির ধৈর্যের বড় অভাব। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়তে সময় লাগে। বঙ্গবন্ধুকে সে সুযোগ দেয়া হলো না। মিথ্যা অপপ্রচার ও বিভ্রান্ত করে মানুষকে বিষিয়ে তোলার চেষ্টা হলো। তিন বছর যেতে পারল না পাটের গুদামে আগুন দেয়া হলো। থানায় আগুন দেয়া হলো। সাতজন সংসদ সদস্যকে হত্যা করা হলো। কিছু হচ্ছে না হচ্ছে না—বলে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হলো। এরপরও যখন বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তায় চিড় ধরাতে পারল না, তখন পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট তাকে হত্যা করা হলো। এগুলো করেছে স্বাধীনতাবিরোধীরা আর তারা ব্যবহার করল কিছু মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার সপক্ষের শক্তিকে। কী হারাল তখন বুঝল না! বঙ্গবন্ধুকে হারিয়ে বুঝতে পেরেছে তারা কী হারিয়েছে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট যদি না ঘটত, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও তাদের সম্মান সবই ঠিক থাকত।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করি। পরে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার এসে তা নষ্ট করে দেয়। এবার আমরা ক্ষমতায় এসে সংবিধান সংশোধন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করতে পেরেছি। মনে রাখতে হবে, ৩৫ বছরে অনেক পানি গড়িয়েছে। ৩৫ বছর আগে বুড়িগঙ্গার পানি স্বচ্ছ ছিল, সেই পানিতে মাছ ছিল, সেটা পান করা যেত। এখন ৩৫ বছর পর সেই বুড়িগঙ্গার পানিতে মাছ নেই। এই পানি সম্পূর্ণ দূষিত। এই ৩৫ বছরে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমরা যদি মনে করি এখন ৩৫ বা ৪০ বছরে ফিরে যাব, সেটা চেষ্টা করলেও সম্ভব হবে না। আমরা সেটা উপলব্ধি করে সুযোগ কাজে লাগিয়ে সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংবিধান সংশোধন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করার প্রচেষ্টা নিয়েছি। এখন এই সংবিধান সংশোধন নিয়ে শুনছি নানা ধরনের কথা—এটা হলো না, ওটা হলো না।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী সংসদে মন্ত্রীদের সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, গত দুদিন ‘সরকার শুধু ব্যর্থ ব্যর্থ ব্যর্থ’ শুনলাম; আজ শুনছি সফল। খতিয়ে দেখলে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সফলতা খুঁজে পাওয়া যাবে। এ ব্যর্থতার আওয়াজ তুলে শত্রুর হাতে অস্ত্র তুলে দেয়ার কোনো অর্থ হয় না। তাহলে যেটুকু অর্জন আমরা করেছি সেটুকুও থাকবে না।
এর আগে সরকারদলীয় সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম বিএসসি’র প্রশ্নের লিখিত উত্তরে প্রধানমন্ত্রী ২০১১ সালের মধ্যে বিদ্যালয়ে গমনোপযোগী সব শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিতকরণে সরকারের কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করে সংসদে জানিয়েছেন, বর্তমানে নিট ভর্তির হার শতকরা ৯৯ দশমিক ৩৪ ভাগ অর্জিত হয়েছে। এছাড়া ২০১৪ সালের মধ্যে শতভাগ সাক্ষরতা অর্জনের লক্ষ্যে রিচিংআউট স্কুল চিলড্রেন প্রকল্প, হার্ড টু রিচ প্রকল্প, সাক্ষরতা-উত্তর ও অব্যাহত শিক্ষার ব্যবস্থা ইত্যাদি কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে।
সরকারদলীয় সংসদ সদস্য নাছিমুল আলম চৌধুরীর প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী অটিজম মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অটিজম বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেন্টার খোলা হয়েছে। এ ব্যাপারে বিশিষ্ট শিশু মনোবিজ্ঞানী সায়মা হোসেন পুতুলের অনুপ্রেরণা ছিল মূল পাথেয়। গত বছরের এপ্রিল মাসে সায়মা হোসেনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘের অনুষ্ঠানে যোগ দেয়। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই অনুষ্ঠানে সায়মা হোসেন অটিজমের ওপর বক্তব্য দেন। এতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়। এছাড়া এ বছরের ২৫-৩০ জুলাই ঢাকায় অটিজম বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভারতের অটিজম আন্দোলনের প্রধান পৃষ্ঠপোষক সোনিয়া গান্ধী, শ্রীলঙ্কার ফার্স্ট লেডি মিসেস রাজাপাকসে, মালদ্বীপের সেকেন্ড লেডি, এ অঞ্চলের পাঁচজন স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ ৩৮ জন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ যোগ দেন। সায়মা হোসেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও অটিজম স্পিকস ইউএসএ’র সহায়তায় এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনের মাধ্যমে সারাদেশে ব্যাপক জনসচেনতার সৃষ্টি হয়।
এ সম্পর্কিত সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী অভিভাবকসহ দেশবাসীকে অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশুদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার না করে তাদের সহযোগিতা ও সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিশুদের সমাজ, পরিবার ও পরিজন থেকে আলাদা করে রাখা যাবে না। তাদের যত সুস্থ বাচ্চাদের সঙ্গে রাখা যাবে ততই দ্রুত তাদের মানসিক বিকাশ ঘটবে। তাদের বিষয়ে আমাদের মনমানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে, কারণ তারা আমাদেরই সন্তান।
তিনি বলেন, অটিস্টিক শিশুদের যতই সাধারণ স্কুলে রাখা যাবে ততই তারা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশবে, ততই তারা নিজেদের সমাজের অংশ হিসেবে মনে করবে। অটিস্টিকদের কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তাদের সহায়তায় বিত্তশালীদের এগিয়ে আসারও আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, প্রতিবন্ধী শিশুদের যে কোনো একটি বিষয়ে দক্ষতা থাকে। এক্ষেত্রে ওটিকে কাজে লাগাতে হবে। এবারের ঈদের শুভেচ্ছা কার্ড তিনি একটি অটিস্টিক শিশুর আঁকা চিত্র দিয়ে করেছেন বলে এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে সায়মা হোসেনকে বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া যায় কি-না, তা জানতে চান আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মেহের আফরোজ চুমকী। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দিয়ে ছেড়ে দিয়েছি। তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করাই ভালো। তবে সরকারে থাকি বা না থাকি, তাদের কোনো পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন হলে সেটা করা হবে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী জানান, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার বিষয়ে গ্র্যাজুয়েশন এবং হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি গ্রহণ করেছে, মেয়ে সায়মা হোসেন ফ্লোরিডা থেকে ডিগ্রি নিয়ে চাইল্ড সাইকোলজির ওপর চার বছরের একটি কোর্স করেছে, তার বোন শেখ রেহানার ছেলে রেদোয়ান সিদ্দিক ববি লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স (এলএসসি) থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছে, মেয়ে রেজোয়ানা সিদ্দিক টিউলিপ ডাবল এমএ করেছে এবং রেহানার বড় মেয়ে রুপন্তি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে।
সর্বশেষ আপডেট বুধবার, ৩০ নভেম্বর -০০১ ০০:০০
Add comment