১২ জুন শনিবাব ছিল পূণ্যতিথি, পূণ্যক্ষণ। কুহু নাচল পর পর ১০টি ভারত নাট্যম ও কুচিপুরি নাচ।
দীর্ঘ ৮ বছরের নিরলস নিষ্ঠা, একাগ্রতা দিয়ে শেষ পর্যন্ত কুহু দীর্ঘ যাত্রাপথের প্রান্তে এসে দাড়াঁল। স্বনামধন্য গুরু গার্গি চট্টোপাধ্যায় এর তত্ত্বাবধানে ওমনা এনসিয়েন্ট আর্টস নামক প্রতিষ্ঠানে চলেছে এ সাধনার পথ। ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যাল নাচের প্রতি অতুলনীয় ও অকৃত্রিম ভালবাসা তার এ সাধনাকে নিয়ে এল সম্পূর্ণ এক নতুন মাত্রায়। নিউইয়র্কের মঞ্চে নৃত্যরতা কুহুকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন কোন পরম নিষ্ঠাবান বিনয়ী ভক্ত তার হৃদয়ের সমস্ত মাধুরী মিশিয়ে দিয়েছিল নাচের প্রতিটি মুদ্রায়। অতুল গৌরবে তা সমর্পিত হয়েছিল সৃষ্টিকর্তার পাদপদ্মে। সাবলীন, স্বচ্ছন্দ নৃত্যকলার মধ্য দিয়ে কুহু ফুটিয়ে তুলেছিল মানব মনের বিচিত্র ব্যঞ্জনা। হিন্দু টেম্পল সোসাইটি বা গণেশ টেম্পল এর সুবিশাল অডিটোরিয়ামে বিভিন্ন দেশের প্রায় ৫ শতাধিক দর্শকের সামনে কুহু নিজেকে তুলে ধরেছিল একজন অনুরাগী নৃত্য পটিয়সী হিসেবে। দর্শকদের মুহুর্মুহু করতালি আর প্রাণান্ত আশীবার্দের মাধ্যমে নৃত্যশিল্পের জটিল অথচ সম্মোহনী কৌশল অত্যন্ত দক্ষতা আর আত্মবিশ্বাসের সাথে কুহু সেদিন শুরু করেছিল নৃত্য জগতে তার দীর্ঘ পথ চলা।
আমেরিকাতে জন্মগ্রহণ করেও নিজের ধর্ম, সংস্কৃতি, কৃষ্টিকে একই সাথে প্রাণ দিয়ে গ্রহণ করেছে পারিবারিক সাংস্কৃতিক পরিবেশের মাধ্যমে। সংগীত শিল্পী কেকা দাস ও সংগীত অনুরাগী, শুদ্ধ সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক, ট্রেক্সটাইল শিল্পে কনসালটেন্ট হিসাবে কর্মরত ইঞ্জিনিয়ার বিদ্যুৎ দাসের প্রথম সন্তান কুহ্।ু এই ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি যেখানে প্রায় লোপ পেতে চলছে অপসংস্কৃতির ভারে সেখানে এ উত্তর আমেরিকায় আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের এ অনবদ্য ও হৃদয়গ্রাহী অনুষ্ঠান উপভোগ করতে পারায় উপস্থিত দর্শকরা মুগ্ধ হয়েছেন এবং অনেক অনেক দিন এ অনুষ্ঠান স্মরণে থাকবে বলে অভিমত পোষণ করেন।
সপ্তাহে দুদিন কমপক্ষে ৩/৪ ঘন্টা নিয়মিত অনুশীলন, ১ ঘন্টা মেডিটেশন চলেছে গত ৮ বছর ধরে। আড়াই মাস আগে থেকে চলেছে আরও কঠিন সাধনা। নিরামিষ খাওয়া থেকে শুরু করে মৌন ব্রত পালন করা পর্যন্ত।
গত শনিবারের পূণ্য তিথিতে বেলা সাড়ে ৪ টা নাগাদ শুরু হয় এ নাচের গ্র্যাজুয়েশনের অনুষ্ঠান। সুপরিসর সৌন্দর্য্যমন্ডিত মঞ্চের একপাশে আদিদেব, নৃত্যু গুরু নটরাজ শিবের মূর্তিকে পূজার মাধ্যমে শুরু হয় এ বিশাল অনুষ্ঠানের। মঞ্চের অন্য পাশে নিবিষ্টচিত্তে সুরের লহরী ছড়াতে সারিবদ্ধভাবে বসেছিলেন বিভিন্ন ষ্টেট থেকে আগত বিখ্যাত কন্ঠ ও বাদ্যযন্ত্র শিল্পীরা। মাঝে মাঝে শুভেচ্ছা বক্তব্য ও সনদপত্র বিতরণ ছাড়া দীর্ঘ সাড়ে ৪ ঘন্টা ধরে কুহু পরিবেশন করে পর পর ১০টি জটিল নৃত্যু। শিব শম্ভু রাধিকা-কৃষ্ণ, নবরাসা ভার্নম, নীলামেঘা ইত্যাদি। কাঁচের পে¬টের প্রান্তে দাঁড়িয়ে মাথায় জল ভর্তি ঘট ও দুহাতে প্রজ্বলিত দ্বীপ নিয়ে কুহুর নৃত্য পরিবেশনা ছিল শ্বাসরুদ্ধকর ভাবে উপভোগ্য।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের কালচারাল মিনিস্টার অভিনেতা অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ। তিনি তাঁর বক্তব্যে কুহুর ভূয়সী প্রশংসা করেন। এ অল্প বয়সে এ দুই কঠিন নৃত্যকলায় কুহুর অনবদ্য বিচরণ, ক্লান্তিবিহীন, শৈল্পিক নৈপূন্যে পরিপুর্ণ এ পরিবেশনা অধ্যাপক আহমেদকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে বলে তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন। একই সাথে এ ভিন্ন সংস্কৃতির দেশে নিজের সংস্কৃতির প্রতি এ অকৃত্রিম ভালবাসা ও দীর্ঘ ৮ বছর ধরে কুহুকে অবিশ্রান্ত চর্চায় সার্বিকভাবে সাহায্য করার জন্য মমতাজউদ্দিন তার পরিবারের প্রতি গভীর সম্মান জ্ঞাপন করেন। বিশেষ বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভিক্টোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের প্রধান ডঃ অসিত রায় চৌধুরী। ‘আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করেও নিজস্ব কৃষ্টি ও সাংস্কৃতিকে বাঁিচয়ে রাখার যে প্রাণান্ত চেষ্টা আজ কুহুর পরিবেশনার মাধ্যমে স্বচক্ষে দেখলাম, বাংলাদেশে বসে এ কল্পনাও করতে পারতাম না’ বলে ডঃ রায়চৌধুরী উল্লেখ করেন। কুহুর পিতামহ শারদা কিংকর মজুমদার ছিলেন রেডিও বাংলাদেশের প্রবাদ প্রতিম যন্ত্রশিল্পী। সে শুদ্ধ সংস্কৃতির ধারা কুহুর রক্তে বইছে বলেও তিন্ িউল্লেখ করেন। অনুষ্ঠানে কুহুকে অভিনন্দন জানিয়ে বক্তব্য রাখেন কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও নিউইয়র্ক পাবলিক স্কুলের শিক্ষক ডঃ দ্বীজেন ভট্টাচার্য। অনুষ্ঠানে কুহুকে আর্শীবাদ করে প্রশংসা সূচক বক্তব্য রাখেন খ্যাতনামা এটর্নী ঢারমেন বেচু, বিখ্যাত কার্ডিওলজিষ্ট ডাঃ রেশমী চারডাভোনি, প্রিয়া ভট্টাচার্য, সুদীপ্তা শ্রীধারা, কুহুর ছোটভাই আকাশ এবং পিসতাতো বোন উর্মি, ভাই অম্লান ও অতনু। এক পর্যায়ে অনুপ্রেরণা দিয়ে বক্তব্য রাখেন কুহুর স্কুলের আর্টের শিক্ষিকা মিস ফিষ্টার। আর্টে কুহুর অসামান্য প্রতিভার কথা তিনি বিশদভাবে তুলে ধরেন। উল্লেখ্য, অডিটোরিয়ামের বাইরে কুহুর আঁকা কয়েকটি ছবি প্রদর্শিত হয়। এরপর ‘‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’’ এই রবীন্দ্র সংগীতটি পরিবেশন করে কুহুর মা বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী কেকা দাস দর্শক শ্রোতাদের ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছেন। অনুষ্ঠানের প্রায় শেষ পর্যায়ে কুহুকে তার বহু প্রতীক্ষিত ভারতনাট্যম ও কুচিপুরিতে বিশেষ দক্ষতার জন্য সনদপত্র প্রদান করেন গুরু গার্গী চট্টোপাধ্যায়ের গডমাদার ও গুরু ডঃ সত্যবতী কুন্ডলা।
এরপর মঞ্চ এসে কুহুকে সম্মাননা পত্র প্রদান করেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শ্রীকৃষ্ণ ভক্তসংঘের নীল কমল ভৌমিক, হিন্দু ফাউন্ডেশনের দীলিপ নাথ, ঐক্য পরিষদের ডঃ জিতেন রায় প্রমুখ। পারিবারিক ভাবে সম্মাননা প্রদান করেন ডঃ প্রদীপ কর ও জলি কর।
সনদপত্র পাওয়ার পর কুহু সভায় উপস্থিত সবাইকে কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানিয়ে ইন্ডিয়ান ক্লাসিকেল নাচের প্রতি তার গভীর ভালবাসার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করে। বিভিন্ন মুদ্রার মাধ্যমে একমাত্র একাগ্রতা আর কঠিন সাধনার দ্বারা নাচের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলা যায় বলে জানায়।
বিখ্যাত প্রাইভেট স্কুল স্ট্যাটেন আইল্যান্ড একাডেমির একাদশ গ্রেডের মেধাবী ছাত্রী, অংকন শিল্পের বিশেষ পারদর্শী কুহু পড়াশুনার অনেক চাপের মধ্যেও বিশুদ্ধ নৃত্য শিল্পের সাধনা সারাজীবন চালিয়ে যাবে বলে অঙ্গীকার করে।
ওমনা পরিবারসহ সমস্ত শিল্পী কলাকুশলী, অভ্যাগত সমস্ত অতিথিদেরকে সার্বিক সহযোগিতা ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন কুহুর বাবা ইঞ্জিনিয়ার বিদ্যুৎ দাস। বিদ্যুৎ দাসের সাথে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন একই প্রকার নাচে গ্র্যাজুয়েট শিলা কৃষ্ণান।