• Page Views 384

সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় বাংলাদেশ নেই কেন?

বিভিন্ন নামকরা সংস্থা বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের র‍্যাঙ্কিং প্রকাশ করলে যথারীতি আমাদের হতাশ হতে হয়। তালিকায় সংখ্যা ৫০০ ছাড়ালেও তাতে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু কেন?

সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় স্থান না পাওয়া নিয়ে সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘দুঃখবোধ’ কাজ করলেও এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের মাথাব্যথা নেই বললেই চলে। বরং তারা ইনিয়ে-বিনিয়ে র‍্যাঙ্কিং নিয়েই প্রশ্ন তোলে।

সমালোচনার মুখে এখানকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তাব্যক্তিদের প্রায়ই বলতে শোনা যায়, ইতিহাস-ঐতিহ্যের দিক দিয়ে তাঁদের প্রতিষ্ঠানটি গর্বের। দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা তাঁদের প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাঁরা সেরা পাঠই শিক্ষার্থীদের দেন। স্নাতকেরা দেশকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তাঁরা সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন।

বর্তমান সময়ে এমন সাফাইয়ের পর র‍্যাঙ্কিংয়ের গুরুত্ব এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তাব্যক্তিরা আদৌ বোঝেন কি না, সে প্রশ্ন এসেই যায়।

শিশির ভট্টাচার্য্যের ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস: আদিপর্ব’ বই থেকে জানা যায়, মধ্যযুগের (পঞ্চম থেকে পঞ্চদশ শতক) ইউরোপে বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎপত্তি। আরব-ইউরোপ যোগাযোগ বিশ্ববিদ্যালয় শুরুর অন্যতম কারণ। সঙ্গে ছিল সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রয়োজন। সেই সময়ে বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ই বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, শহর থেকে শহর, দেশ থেকে দেশে ছাত্র-শিক্ষকদের যাতায়াত ছিল। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক আদান-প্রদানে জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ছিল। জ্ঞানের ভান্ডার সমৃদ্ধ হচ্ছিল। কোথাও স্বার্থের কারণে কোনো কর্তৃপক্ষ নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্ব থেকে আলাদা করার চেষ্টা চালিয়েছিল। তবে তা কাজ দেয়নি। বাধা-বিপত্তি ছাপিয়ে জ্ঞানভিত্তিক ঐক্য তৈরি হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় মধ্যযুগের মানুষকে আলোর পথ দেখায়।

মধ্যযুগের শেষে ইউরোপে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়তে থাকে। আধুনিক যুগে এই ধারায় আরও গতি আসে। শিশির ভট্টাচার্য্য জানাচ্ছেন, আধুনিক যুগের প্রথম দিকে (চতুর্দশ শতকের শেষে থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত) সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনমূলক গবেষণার দিক থেকে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দারুণ উন্নতি করে। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতকে আটলান্টিকের ওপারে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে আমেরিকায় ৪০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এগুলো ধীরে ধীরে ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সারা বিশ্বের মানুষের প্রথম পছন্দ হয়ে দাঁড়ায় উত্তর আমেরিকা, তারপর ইউরোপ।

সভ্যতার মতো উচ্চশিক্ষাও বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। উচ্চশিক্ষার বিষয়টি আর আগের জায়গায় নেই। এখন প্রতিযোগিতা ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার সবাই র‌্যাঙ্কিংয়ের পেছনে ছুটছে। লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক র‍্যাঙ্কিং ও উচ্চশিক্ষার পরিবর্তন নিয়ে একটি প্রতিবেদন করেছে। উচ্চশিক্ষায় এই মুহূর্তে র‍্যাঙ্কিং কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার বিবরণ এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। একই সঙ্গে র‍্যাঙ্কিং কীভাবে উচ্চশিক্ষাকে বদলে দিচ্ছে, সে উদাহরণও আছে।

জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির যুগে বিশ্ববিদ্যালয়কে এখন আর শিক্ষার্থীদের সাদামাটা পাঠদান ও সনদ প্রদানের কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই। ঐতিহ্য নিয়ে পড়ে থাকার দিনও শেষ। বিশ্ববিদ্যালয় এখন ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধির ‘ইঞ্জিন’। মূল্যবান তথ্য বা জ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ উৎস বিশ্ববিদ্যালয়। তারা মানবসম্পদ তৈরি করে। নতুন ধারণার জন্ম দেয়।

উচ্চশিক্ষা দেশ বা আঞ্চলিক গণ্ডির মধ্যেও আটকে নেই। উচ্চশিক্ষার বিশ্বায়ন ঘটেছে। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যকার প্রতিযোগিতা বৈশ্বিক। সাংহাই, টাইমস হাইয়ার এডুকেশন (টিএইচই), কিউএসের মতো সংস্থার র‌্যাঙ্কিং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় নতুন মাত্রা এনেছে। বৈশ্বিক এই প্রতিযোগিতা সম্মানের, সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলার। প্রতিযোগিতায় অংশ না নেওয়ার অর্থ পিছিয়ে পড়া।

নতুন বাস্তবতায় বিভিন্ন দেশের সরকারও নড়েচড়ে বসেছে। তারা বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, র‌্যাঙ্কিংয়ে অন্তর্ভুক্তি ও অগ্রগতির জন্য উদ্যোগ নিচ্ছে। এই খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। উদাহরণ হিসেবে চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ফ্রান্স, জার্মানির কথা বলা যায়। এ ক্ষেত্রে বিশেষ করে চীনের সাফল্য নজরকাড়া। সাংহাই র‌্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চীনেরই আছে ৪৫টি।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত তাদের ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এমনকি নাইজেরিয়ার মতো দেশ ২০২০ সাল নাগাদ তাদের অন্তত দুটি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের শীর্ষ ২০০টির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য ঠিক করেছে।

বাংলাদেশের এমন কোনো লক্ষ্য আছে বলে শোনা যায় না। এখানে র‌্যাঙ্কিংয়ের ‘ধার না ধরা’র একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। গত বছরের নভেম্বরে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি র‍্যাঙ্কিং প্রকাশের উদ্যোগ দেখা যায়। বাংলা ট্রিবিউন-ঢাকা ট্রিবিউনের যৌথ উদ্যোগের এই ব্যাংকিংয়ের শীর্ষে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। দ্বিতীয় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়। তৃতীয় ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি)। এই র‍্যাঙ্কিং মানদণ্ড নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা হলেও উদ্যোগটাকে একটা ‘শুরু’ হিসেবে স্বাগত জানানোই যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক র‌্যাঙ্কিংয়ে শিক্ষাদানের মান অন্তর্ভুক্ত হয় না। গবেষণার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়। যেমন সাংহাই র‌্যাঙ্কিং পুরোমাত্রায় গবেষণানির্ভর। র‌্যাঙ্কিং সংস্থাগুলো স্কোরিংয়ে বিজ্ঞান তথা মৌলিক বিজ্ঞানের গবেষণা গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেয়।

র‌্যাঙ্কিং প্রতিযোগিতায় বৈজ্ঞানিক গবেষণা গুরুত্ব পাওয়ায় উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ছে। বাড়ছে গবেষণার পরিমাণ। এসব গবেষণা মানবকল্যাণে অবদান রাখছে।

র‌্যাঙ্কিংয়ের কারণে জ্ঞানের আন্তর্জাতিকীকরণও হচ্ছে। গবেষকেরা একে অপরের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছেন। নিজেদের মধ্যে জ্ঞান বিনিময় করছেন। বৈশ্বিক সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে একসঙ্গে কাজ করছেন। এতে সামগ্রিকভাবে বিশ্বই উপকৃত হচ্ছে।

অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষার বৈশ্বিক প্রবণতার বিপরীত পথে চলছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ৪৩তম বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, দেশের মোট ৬৫ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হয় না। গবেষণার বদলে চলে মুখস্থনির্ভর পড়ালেখা।

দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণা খাতে বরাদ্দের হারের চিত্রও বেশ করুণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে গবেষণা খাতে বরাদ্দ রাখা হয় ১৪ কোটি টাকা। এই বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ২ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে গবেষণায় বরাদ্দ ছিল মাত্র ১ শতাংশ।

বৈশ্বিক র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ঠাঁই না পাওয়ার জন্য এই এক গবেষণা খাতই যথেষ্ট।

সাইফুল সামিন: সাংবাদিক

সূত্র:প্রথম আলো

Share

বিশ্ববিদ্যালয়ে গুচ্ছ ভিত্তিতে ভর্তি আগামী বছর থেকে

Next Story »

নিষিদ্ধ ঘোষিত মেডিকেল কলেজে ভর্তির দায় নেবে না সরকার

Leave a comment

LifeStyle

  • কালার ছাড়াই কালো চুল!

    3 days ago

    বয়স ৪০ পেরোলেই চুলে পাক ধরতে শুরু করে, এই ধারণা এখন আর কাজে আসে না। আজকাল অনেকেরই ত্রিশের পরই দেখা যায় মাথার অর্ধেকের বেশি চুল পেকে গেছে। ...

    Read More
  • দেশীদশ’র একুশ সংগ্রহ

    3 days ago

    ভাষার মাস উপলক্ষে দেশীদশ সাজিয়েছে বিশেষ একুশ সংগ্রহ। দেশীদশ বাংলাদেশের শীর্ষ দশটি ফ্যাশন হাউসের একটি সমন্বিত উদ্যোগ। যাদের উদ্দেশ্য দেশীয় কৃষ্টি, সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে এদেশের তাঁত, কারু ও ...

    Read More
  • পার্লারে খোঁপা, কীভাবে ছাড়বে চুলের জট!

    3 days ago

    নিজের বিয়ে হোক বা আত্মীয়-বন্ধুর অথবা কোনো বড় অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় অনেকেই পার্লারে গিয়ে সাজতে পছন্দ করেন। চুলও সেট করে নেন, যারা খোঁপা করেন, তারা অনেকেই বেশ ...

    Read More
  • বসন্তে বসন্ত (চিকেনপক্স) হলে যা করবেন…

    3 days ago

    বসন্তের ফুল-পাখি আর প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলেও আমরা ভয়ে থাকি বসন্ত (চিকেনপক্স) নিয়ে। এটি ভাইরাসজনিত রোগ। এতে শরীরের নানা জায়গায় চুলকানিসহ গোটা হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলেন:   ...

    Read More
  • ময়মনসিংহে সেইলর

    3 days ago

    হাওর জঙ্গল মইষের শিং, এই তিনে ময়মনসিং’ প্রবাদ-প্রবচনে এভাবেই পরিচয় করানো হতো প্রাচীন জেলা ময়মনসিংহকে। স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে আধুনিকতার যুগপৎ মেলবন্ধনেই এখানে নিয়ে আসতে চায় ফ্যাশন হাউস ...

    Read More
  • উচ্চতা অনুযায়ী স্বাভাবিক ওজন জেনে নিন

    3 days ago

    ওজন এবং উচ্চতার একটি পরিমাপের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি আমাদের ওজন স্বাভাবিক, না কম বা বেশি। আর এই পদ্ধতির নাম হচ্ছে বিএমআই (Body Mass Index)। প্রথমেই আপনার ...

    Read More
  • এবার একুশের অপেক্ষা…

    3 days ago

    বাঙালির যা কিছু অহংকারের, একুশ তার একটি। আর বাংলা বর্ণমালা আমাদের প্রাণের চেয়ে প্রিয়। তাই দেশের জনপ্রিয় ফ্যাশন হাউস রঙ বাংলাদেশ এবার ভাষার মাস পোশাকের নতুন সংগ্রহ দিয়ে ...

    Read More
  • খুব দ্রুত ওজন কমাতে চান?

    3 days ago

    ভেবে দেখুন তো, যখন কোনো অসুখের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হয়, তখন কারো দুই দিনে সুস্থ অনুভব হয় আবার কারো তিন দিনে। তাই বলে কোনো ডাক্তার বা ওষুধ ...

    Read More
  • মধুর ক্যান্টিনে ছাত্রদল

    1 week ago

    ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনকে সামনে রেখে দীর্ঘ প্রায় ৯ বছর পর মধুর ক্যান্টিনে প্রবেশ করেছে ছাত্রদল। আজ বুধবার সকাল ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের ...

    Read More
  • বেঙ্গল বই, যেখানে বইয়ের মাঝে ডুবে থাকা যায়

    1 week ago

    কথায় বলে মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু হতে পারে বই। আর যারা বইয়ের সাথে এমন বন্ধুত্ব গড়েছেন তারা চাইলে ডুবে যেতে পারেন বেঙ্গল বই এ থাকা হাজারো বইয়ের সমারোহে।  ...

    Read More
  • Read

    More